কেন ভ্যাটিকান সিটি খ্রিস্টান ধর্মের কেন্দ্র ?

ভ্যাটিকান সিটি দেশ পরিচিতি

 

ইতালির রোম শহরে ভ্যাটিকান সিটি অবস্থিত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যেখানে পোপ  এখানকার রাষ্ট্রনেতা। পোপ খ্রিস্ট ধর্মের রোমান ক্যাথলিক শাখার প্রধান ধর্ম গুরু। রোম শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ভ্যাটিকান সিটি পোপের প্রধান কার্যালয়। তাছাড়া এটি রোমান ক্যাথলিক গির্জার বিশ্ব সদর দফতর হিসেবে কাজ করে। সাধারণত ভ্যাটিকান সিটিকে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র  বলা হয়ে থাকে, যার আয়তন প্রায় ১১০ একর।

উত্তর-পশ্চিম রোমের ভ্যাটিকান নামক পাহাড়ের উপর একটি ত্রিভুজাকৃতি এলাকা রয়েছে যা তিবের নদীর ঠিক পশ্চিমে অবস্থিত ভ্যাটিকান শহর । প্রাচীরের ভেতরে আছে উদ্যান, বাহারী নানারকম দালান ও চত্বরের সমাবেশসহ আরও অনেক কিছু । সবচেয়ে বড় দালানটি হলো রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান গির্জা ও প্রবিত্র স্থান ।

ভ্যাটিকান সিটির নিজস্ব সংবিধান, ডাকব্যবস্থা, পতাকা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতীক বিদ্যমান। ভ্যাটিকানের নিজেদের সেনাবাহিনীও আছে, যাকে তারা সুইস গার্ড বলে ডাকে; এর সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০০। ভ্যাটিকান রেডিও নামের নিজস্ব সরকারি রেডিও স্টেশন যা সারা বিশ্বে পোপের বানী ছড়িয়ে দিচ্ছে । ২০০১ সালে ভ্যাটিকান শহরে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১০০০। এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে ও পোপের দেয়া বিশেষ দায়িত্ব পালন করে এখানকার নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব।

ক্যাথলিক গির্জা বহু শতাব্দী ধরে মধ্য ইতালির বেশ কিছু এলাকাতে এই রাষ্ট্রগুলি স্থাপন করেছিল, যার শাসনকর্তা ছিলেন পোপ। ইতালীয় সরকার ও পোপ সম্প্রদায়ের মধ্যে বহু বছর ধরে বিতর্কের পর ১৯২৯ সালে লাতেরান চুক্তির অধীনে ভ্যাটিকান সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চুক্তির অধীনে ক্যাথলিক গির্জা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে অন্য সব পোপীয় রাষ্ট্র থেকে দাবী প্রত্যাহার করে নেয় এবং স্বাধীন ভ্যাটিকান সিটি হিসেবে সার্বভৌমত্ব অর্জন করে। এর বর্তমান প্রধান পোপ ফ্রান্সিস, ২০১৩ সালের ১৩ই মার্চ দায়িত্বগ্রহণ করেন ।

লাটেরান চুক্তি অনুসারে ভ্যাটিকান সিটির অঞ্চলসমূহ

খ্রিস্ট ধর্মের শুরু অনেক আগে থেকেই এই রাজ্যের স্থানটুকুকে পবিত্র বলে গণ্য করা হতো এবং রোমের এই অংশটুতুতে এর আগে কখনই বসতি গড়ে উঠেনি বা কেউ এখানে বসতি স্থাপন করতে চায়নি। রোমান সাম্রাজ্যের সময় এই স্থানে ফ্রিজিয়ান দেবী সিবেল এবং তার স্বামী আটিসের উপাসনা করা হতো। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর কোনো এক সময়ে আগ্রিপিনা দ্য এল্‌ডার (খ্রিস্টপূর্ব ১৪ – ৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) এই অঞ্চলের একটি পাহাড় কেটে বিশাল উদ্যান তৈরি করা হয়েছিল । পরবর্তীতে সম্রাট ক্যালিগুলা এখানে একটি সারকাস তৈরির উদ্যোগ নেন যদিও তিনি তা সম্পূর্ণ তৈরি করে যেতে পারেননি। তার পরবর্তী সম্রাট নিরো এই সার্কাস সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন । এই সার্কাসটিকে তাই নিরোর সার্কাস নামে ও বলা হয়ে থাকে । বর্তমানে সেই ভ্যাটিকানের একমাত্র দৃশ্যমান ভগ্নাবশেষ হচ্ছে ভ্যাটিকান ওবেলিস্ক। এই ওবেলিস্কটি সম্রাট ক্যালিগুলা হেলিওপলিস থেকে ভ্যাটিকানে নিয়ে এসেছিলেন তার সার্কাসের স্পিনা সাজানোর জন্য। ৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রোমে বৃহৎ অগ্নিকাণ্ডে শহীদ খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল হিসেবে এই স্থানটিকে ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রাচীন প্রথাগত বিশ্বাস অনুসারে বলা হয় এই সার্কাসের প্রান্তরেই সেন্ট পিটারকে মাথা নিচে ও পা উপরে দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। সার্কাসের বিপরীত দিকে ছিল একটি সমাধিসৌধ, যা ভিয়া করনেলিয়া দ্বারা সার্কাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিল। এই ভ্যাটিকানেই বহুত্ববাদী ধর্মগুলোর (যেমন প্যাগান ধর্ম) উপাসনালয়, শেষকৃত্যের সৌধ এবং অন্যান্য সৌধ ও মিনার নির্মিত হয়েছিল। এই সবকিছু নির্মিত হয়েছিল ৪র্থ খ্রিষ্টাব্দের আগে। ৪র্থ খ্রিষ্টাব্দের প্রথমভাগে সম্রাট কন্‌স্টান্টাটাইন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং তিনিই ভ্যাটিকানের কেন্দ্রভূমিতে সেন্ট পিটারের ব্যাসিলিকা নির্মাণ করেন। তখন ভ্যাটিকানের প্যাগান স্থাপনাসমূহ ধ্বংস করে ফেলা হয়। এই ব্যাসিলিকাটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে পোপদের সক্রিয় তত্ত্বাবধানে ব্যাসিলিকার মূল স্থাপনা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষত রেনেসাঁর সময় এর খননকাজ দ্রুত এগোতে থাকে। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে পোপ দ্বাদশ পিউস-এর নির্দেশে সম্পূর্ণ স্থাপনাটি ভূমি থেকে উত্তোলিত করা হয়।

ভ্যাটিকান শহরের রাজনীতি

 

ভ্যাটিকান শহরের রাজনীতি একটি পরম ধর্মীয় রাজতন্ত্র ধারা প্রচলিত। পোপ হলেন সেখানকার রাষ্ট্রের প্রধান। রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্মকাণ্ড, আইন প্রণয়ন ও বিচার ব্যবস্থা সমস্ত কিছু পোপের অধীনে হয়ে থাকে । বর্তমানে ভ্যাটিকান সিটি সারাবিশ্বের রোমান ক্যাথলিকদের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। এটি রোমান ক্যাথলিক গির্জার বিশ্বের প্রধান দফতর হিসেবে কাজ করে। ভ্যাটিকান সিটির নিজস্ব সংবিধান, সীলমোহর, পতাকা, রয়েছে।

ভ্যাটিকান সিটির আয়তন মাত্র ০.৪৪ বর্গকিলোমিটার। এটি ইতালির রোম শহরের মধ্যস্থলে প্রাচীর বেষ্টিত একটি এলাকা। পুরো শহরটি মূলত একটি ছোট পাহাড়ের উপর অবস্থিত, যার নাম ভ্যাটিকান পাহাড়।

নিজস্ব মুদ্রা হিসেবে ইউরো ব্যবস্থা চালু রয়েছে দেশটিতে। ২০০০ সালে দিকে ইতালির সঙ্গে ভ্যাটিকানও ইউরো মুদ্রা প্রচলন করেছেন। তবে ভ্যাটিকানের ইউরো এর থেকে একটু আলাদা।

ভ্যাটিকান সিটির নির্দিষ্ট কোন দাপ্তরিক সরকারি ভাষা নেই, তবে এখানে ইতালীয় ভাষা সবক্ষেত্রে প্রচলিত ভাষা।  রোমান ক্যাথলিক গির্জার দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে লাতিন ভাষার একটি বিশেষ প্রভাব এখানে আছে।

এখানের উচ্চ শ্রেণির লোকেরা সাধারণত ইতালীয় ভাষায় কথা বলে। তাছাড়া ধর্মীয় অনুষ্ঠানে লাতিন ভাষা ও ব্যবহার করে। ভ্যাটিকানসিটির বাসিন্দারা রোমান ক্যাথলিক ধর্ম অনুসারী হয়ে থাকে ।

তাছারা অতীতে অনেকেই ভ্যাটিকান সিটিকে অপরাধের দেশ বলে থাকতেন । জনসংখ্যার তুলনায় এখানে অপরাধের পরিমান ছিল অনেক বেশি । বিগত ২০০৬ সালে দেশটির জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৪৯২ প্রায়। আর সেই সঙ্গে তালিকাভুক্ত অপরাধের সংখ্যা পায় ৮২৭টি। তার মানে প্রত্যেক নাগরিক ১.৬৮টি অপরাধের সঙ্গে জড়িত বলে হিসাব বলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *